Disappearance Day of Srila Tirtha Goswami Maharaj
পূর্ববঙ্গে নোয়াখালি জেলায় সন্দীপ হাতিয়া গ্রামে বাংলা ১২৮৩ সালে চৈত্র মাসে শ্রীমদ্ভক্তিপ্রদীপ তীর্ঘ মহারাজের জন্ম হয়। পিতা শ্রীযুক্ত রজনীকান্ত বসু, মাতা শ্রীযুক্তা বিধুমুখী বসু। শ্রীযুক্ত রজনী কান্ত বসু মহাশয় সরকারী চাকুরী করতেন। তিনি বাঘনা পাড়া গোস্বামীদের শিষ্য ছিলেন, পরে শ্রীমভক্তি বিনোদ ঠাকুরের শ্রীচরণ আশ্রয় করেন। শ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভুপাদ তাঁকে বাবাজী বেশ দেন এবং শ্রীরাধাগোবিন্দ দাস বাবাজী নাম প্রদান করেন। জীবনের শেষ সময়ে পুরী ধামে তিনি অবস্থান করেছিলেন। তাঁর পত্নী শ্রীযুক্তা বিধুমুখী বসুও শ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের শিষ্যা ছিলেন। তিনি শেষ বয়সে শ্রীনবদ্বীপ ধামে অবস্থান করেছিলেন।
শৈশবে শ্রীমদ ভক্তিপ্রদীপ তীর্থ মহারাজের নাম ছিল—শ্রীজগদীশ। তিনি কলিকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ের বি. এ. ডিগ্রি প্রাপ্ত হয়ে শিক্ষকতার কার্যা করতেন। তিনি সপত্নীক কলিকাতায় থাকতেন। জগদীশ বাবুর কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীঅনন্ত বসু (ভক্তিপ্ৰসাদ পুরী গোস্বামী ঠাকুর)।
বাংলা ১৩১৬ সালে ১১ই চৈত্র, ইংরাজী ১৯১০ সালে ২৫শে মার্চ ফাল্গুনী পূর্ণিমায় শ্রীশ্রীগৌর-জন্মোৎসব-দিনে জগদীশবাবু পণ্ডিত বৈকুণ্ঠনাথ ঘোষাল ভক্তিতত্ত্ব বাচস্পতি মহাশয়ের সঙ্গে ধুবুলিয়া ষ্টেশন থেকে পদব্রজে শ্রীমায়াপুরে আগমন করেন এবং শ্রীশ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের প্রথম দর্শন লাভ করেন। তখন শ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় শ্রীমহাপ্রভুর মন্দির সন্নিকটে উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর সম্মুখে শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর ও টাকির জমিদার রায় শ্রীযতীন্দ্রনাথ চৌধুরী এম. এ. মহাশয় প্রমুখ সজ্জন ব্যক্তিগণ বসে তাঁর মুখে হরিকথা শুনছিলেন।
অতঃপর শ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের সঙ্গে পণ্ডিত বৈকুণ্ঠনাথ ঘোষাল মহাশয় শ্রীযুত জগদীশ বাবুর পরিচয় করিয়ে দিলেন। শ্রীযুত জগদীশবাবু শ্রীল ঠাকুর মহাশয়ের শ্রীচরণ ধরে দণ্ডবৎ করে ক্রন্দন করতে করতে তাঁর কৃপা ভিক্ষা করলেন। শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় বললেন—“আপনি শিক্ষিত সম্মানার্হ । সুতরাং আপনি যদি শ্রীমন্মহাপ্রভুর কথা প্রচার করেন বহুলোক তাতে আকৃষ্ট হবে।”
ঐদিন অপরাহকালে শ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর জগদীশ বাবুকে বহুক্ষণ হরিকথা শ্রবণ করান এবং বলেন—আপনি শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয়ের আদেশ নিয়ে আগামী কল্য কুলিয়ার চড়ায় ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীমদ্ গৌরকিশোর দাস বাবাজী মহারাজের শ্রীচরণ দর্শন করুন। জগদীশবাবু প্রাতঃকালে কুলিয়ার চড়ায় শ্রীল বাবাজী মহারাজের দর্শনে এলেন, ভূমিতে পড়ে দণ্ডবৎ করলেন এবং একটি তরমুজ ফল ভেট দিলেন। শ্রীল বাবাজী মহারাজ বাইরের লোকের দেওয়া জিনিস প্রায় গ্রহণ করতেন না, কিন্তু কৃপা করে সেই তরমুজটী গ্রহণ করলেন।
শ্রীল বাবাজী মহারাজ বললেন—আপনাকে কে পাঠালেন?
জগদীশবাবু – —আমি ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ও সরস্বতী ঠাকুরের নিৰ্দ্দেশে এসেছি।
শ্রীল বাবাজী মহারাজ- -আপনি কীৰ্ত্তন জানেন?—একটি কীৰ্ত্তন করুন ।
জগদীশবাবু শ্রীনরোত্তম ঠাকুর মহাশয়ের ‘গৌরাঙ্গ বলিতে হবে পুলক শরীর’ গীতটী করলেন। শ্রীল বাবাজী মহারাজ শুনে খুব খুশী হলেন। বললেন গুরুবৈষ্ণবের প্রতি শ্রদ্ধাবিশিষ্ট হবেন, তৃণাদপি সুনীচ ও তরুর ন্যায় সহিষ্ণু হয়ে সর্ব্বদা নাম করবেন ও অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করবেন।
জগদীশ বাবু — আমার এখনও শুরু পদাশ্রয় হয় নাই।
শ্রীলবাবাজী মহারাজ—মায়াপুরে ও শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরের দর্শন পেয়েছেন। মায়াপুর আত্মনিবেদনের স্থান। সেখানে সদগুরুর চরশে আত্মনিবেদন করেছেন আবার গুরু পদাশ্রয় হয় নাই বলছেন কেন? ভক্তিবিনোদ ঠাকুর আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। যান তাঁর কৃপা গ্রহণ করুন। শ্রীল বাবাজী মহারাজের কথা শুনে জগদীশবাবু সেই দিনেই কুলিয়ায় মাথা মুণ্ডন করে গঙ্গাস্নান পূর্ব্বক গোদ্রুমে শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ভজন কুটীরে এলেন ও দ্বিপ্রহরে মন্ত্র দীক্ষা প্রাপ্ত হলেন। ঠাকুর মহাশয়ের সেবক শ্রীযুত কল্যাণ কল্পতরু দাস ব্রহ্মচারী ঠাকুরের ভোজন অবশেষ প্রসাদ জগদীশ বাবুকে দিলেন। তিনি আগে শ্রীগুরুর অধরামৃত নিয়ে তারপর ভোজন করলেন। ঐ দিবসে বেলা দুইটার সময় শ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় শিক্ষাষ্টক ব্যাখ্যা করে সকলকে শুনান। অপরাহ্ন কালে শ্রীকৃষ্ণদাস বাবাজী চৈতন্য চরিতামৃত পাঠ করেন এবং শ্রীল ঠাকুর মহাশয় ব্যাখ্যা করেন।
কিছুদিন পরে কলিকাতা ‘ভক্তিভবনে’ শ্রীমদ্ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরের নির্দেশে শ্রীজগদীশ বাবুকে, বসন্ত বাবুকে ও মম্মথ বাবুকে শ্রীগোপালভট্ট গোস্বামীর সৎক্রিয়াসার দীপিকার বিধান অনুসারে পঞ্চরাত্র উপনয়ন সংস্কার প্রদান করেন এবং ব্রহ্মগায়ত্রী ও গৌরাঙ্গ গায়ত্রী প্রদান করেন।
জগদীশ বাবুর শাস্ত্র অনুশীলন ও সাধু গুরুর সেবা প্রভৃতি দেখে শ্রীমদভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভুপাদ তাঁকে ‘’ভক্তিপ্রদীপ” আখ্যা প্রদান করেন। তখন থেকে তিনি শ্রীজগদীশ ভক্তিপ্রদীপ নামে খ্যাত হন। শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তিশাস্ত্রী এবং সম্প্রদায় বৈভবাচার্য্য পরীক্ষা প্রবর্তন করেন। জগদীশবাবু সে পরীক্ষা দিয়ে বিদ্যাবিনোদ ভক্তিশাস্ত্রী সম্প্রদায় বৈভবাচার্য্য পদবী লাভ করেন। তিনি ছুটি পেলেই গোস্লম ধামে শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরের নিকট যেতেন এবং ছুটির দিনগুলি তথায় কাটাতেন। তথায় অপরাহ্ন কালে তিনি শ্রীল ঠাকুর মহাশয়ের নির্দেশ অনুসারে শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত পাঠ করতেন স্বয়ং ঠাকুর মহাশয় তার ব্যাখ্যা করতেন। শ্রীগোক্রমে শ্রীল ঠাকুর মহাশয়ের কাছে শ্রীমদ্ কৃষ্ণদাস বাবাজী ও কয়েকজন ভক্ত থাকতেন। শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরের আদেশে প্রাতঃকালে তাঁরা গোদ্রুম ধামে টহল দিতেন। তখন তাঁরা এই গানটা গাইতেন—“নদীয়া গোদ্রুম নিত্যানন্দ মহাজন পাতিয়াছে নামহট্ট জীবের কারণ।।”
ইংরাজী ১৯১৪ সালে ২৩শে জুন শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর অপ্রকট হলেন। সে দিবস তথায় শ্রীজগদীশ বিদ্যাবিনোদ ভক্তিপ্রদীপ মহাশয় উপস্থিত ছিলেন। সেই দিবস রাত্রে শ্রীল প্রভুপাদ কর্মজড় স্মাৰ্ত্তবাদ খণ্ডন এবং শ্রীহরি ভক্তিবিলাস ও সৎক্রিয়া সার দীপিকায় সদাচার সম্বন্ধে বহু উপদেশ বাণী সকলকে শ্রবণ করান।
শ্রীজগদীশ বিদ্যাবিনোদ ভক্তি প্রদীপ মহাশয়ের পত্নী স্বধামে গমন করলে ইংরাজী ১৯২০ সালের কার্তিক মাসে শ্রীল প্রভুপাদ সরস্বতী ঠাকুর তাঁকে ভাগবত ত্রিদণ্ডী সন্ন্যাস প্রদান করেন। তখন থেকে ত্রিদণ্ডিস্বামী শ্রীমদ্ভক্তি প্রদীপ তীর্থ মহারাজ এই নামে অভিহিত হন। সন্ন্যাসের পরদিন তাঁকে প্রভুপাদ পূর্ববঙ্গে প্রচারে যাবার আদেশ করেন। তিনি কতিপয় ব্রহ্মচারী সহ তার পরের দিনই পূর্ব্ববঙ্গে যাত্রা করেন।
তিনি যেমন ছিলেন বিদ্বান তেমনি ছিলেন রূপবান—তিনি সুবক্তাও ছিলেন। তাঁর অমায়িক ব্যবহারে সকলে মুগ্ধ হত। তিনি কিছুদিন পূৰ্ব্ববঙ্গে প্রচার করার পর কলিকাতায় ফিরে এলেন এবং বর্দ্ধমান, মেদিনীপুর ও উড়িষ্যার দিকে যাত্রা করেন। তিনি শ্রীল প্রভুপাদের প্রথম সন্ন্যাসী ছিলেন। প্রভুপাদ অতঃপর পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত তাঁর চব্বিশ জন শিষ্যকে ত্রিদন্ডী সন্ন্যাস প্রদান পূর্ব্বক গৌরবাণী প্রচারের জন্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেন।
জগদগুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভুপাদ ইংরাজী ১৯৩৩ সালের ১৮ই মার্চে ত্রিদণ্ডিস্বামী শ্রীমদ্ভক্তি প্রদীপ তীর্থ মহারাজ, ত্রিদণ্ডীস্বামী শ্রীমদ্ভক্তিহৃদয় বন মহারাজ ও শ্রীযুত সচ্চিদানন্দ দাসাধিকারী ভক্তিশাস্ত্রী এম. এ. মহোদয়কে ইউরোপে গৌর-বাণী প্রচার করবার জন্য বিদায় অভিনন্দন প্রদান করেন।
ইউরোপে শ্রীমদ্ভক্তি প্রদীপ তীর্থ মহারাজ উৎসাহের সহিত কিছু বর্ষ গৌরবাণী প্রচার করেন। সেই সময় তিনি তথায় ইংরাজী ভাষায় শ্রীগৌরসুন্দরের জীবনী ও গীতার অনুবাদ করেন। এ ছাড়া আরও বহু প্রবন্ধাদি লেখেন।
বাংলা ১৩৪৩ সাল ইংরাজী ১৯৩৬ সন ৩১শে ডিসেম্বর ১৫ই পৌষ জগদগুরু শ্রীশ্রীমভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভুপাদ অপ্রকট লীলা আবিষ্কার করেন। সে সময় শ্রীমক্তিপ্রদীপ তীর্ঘ মহারাজ শ্রীল প্রভুপাদের শ্রীপাদপদ্মে ছিলেন। তাকে এবং অন্যান্য শিষ্যগণকে তিনি কৃপা আশীর্ব্বাদ দিয়ে সকলকে পরম উৎসাহের সহিত শ্রীরূপ-রঘুনাথের কথা প্রচার করতে আদেশ দিয়ে অপ্রকট হন ।
বাংলা ১৩৪৩, ইংরাজী ১৯৩৭, ২৬শে মার্চ শ্রীধাম মায়াপুরে যোগপীঠে শ্রীগৌরজয়ন্তী বাসরে ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীশ্রীমদ্ভক্তি প্রসাদ পুরী গোস্বামীর আচার্যাভিষেক কার্য্য আরম্ভ হলে শ্রীমদ্ভক্তিপ্রদীপ তীর্থ মহারাজ ত্রিদণ্ডিপাদগণের তরফ থেকে অভিনন্দন অর্থে জানিয়ে ছিলেন।
বাংলা ১৩৪৭, ইংরাজী ১৯৪১ সন ২৯শে ফাল্গুন শ্রীচৈতন্য মঠে প্রাতে গৌড়ীয় মিশনের (১৮৬০ খৃষ্টাব্দের আইনানুযায়ী রেজিস্ট্রীকৃত) সভ্যবৃন্দের সম্মিলিত প্রথম বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। মিশনের সভাপতি ত্ৰিদণ্ডিস্বামী শ্রীমদ্ভক্তি প্রদীপ তীর্থ মহারাজ হন।
সুদীর্ঘকাল গৌড়ীয় মিশনের প্রচার কার্য্য করবার পর শ্রীমদ্ভক্তি প্রদীপ তীর্থ মহারাজ বাংলা ১৩৫০ সালের বৈশাখ মাসে শ্রীজগন্নাথ ক্ষেত্র ধামে আগমন করেন ও গুরুবর্গের নির্দেশক্রমে তথায় শ্রীপুরুষোত্তম মঠে ঐকান্তিক ভজন করতে থাকেন। তখন তাঁর বয়স আনুমানিক ৮২ বছর।
ইংরাজী ১৯৫৪ সন অগ্রহায়ণ মাস পূর্ণিমা তিথি শ্রীল মহারাজের তিরোধান দিন। শ্রীপুরুষোত্তম ধাম, পবিত্র মাস ও পবিত্র তিথি, সবের একাধারে সমাবেশ। সেদিন প্রাতঃকাল থেকেই শ্রীল মহারাজের এক অভিনব বাৎসল্য ভাব সকলের প্রতি প্রকাশ পাচ্ছিল, সকলকে ডেকে কত স্নেহ করে ভগবদ ভজনের উপদেশ দিতে লাগলেন। তাঁর দৈনন্দিন নিয়ম অনুযায়ী প্রাতঃকালে শ্রীবিগ্রহ দর্শন, দণ্ডবৎ, স্তবাদি পাঠ করে নিজ ভজন গৃহে এসে বসলেন। প্রাতঃকালে কিছু দুধ মাত্র পান করলেন। শ্রীগৌরাঙ্গ স্মরণ মঙ্গল ও শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামীর স্বনিয়ম দশকম্ পাঠ করতে করতে কত রোদন, কত দৈন্যভাব প্রকাশ করলেন। তারপর শ্রীমদ্ভাগবতের দশমস্কন্ধীয় স্তব (ব্রহ্মাস্তবাদি) ভাবাবিষ্ট হৃদয়ে পড়তে লাগলেন। সাড়ে এগারটা পর্যন্ত পাঠ করলেন। সেবক শ্রীযুত অনাথনাথ দাস ব্রহ্মচারী দ্বিপ্রহর কালে স্নানাদির জল ঠিক করে মহারাজের শ্রীঅঙ্গে তৈলমর্দন করে দিলেন, অনন্তর শ্রীল মহারাজ স্নান করলেন। সেবককে নূতন বস্ত্র বের করে দিতে বললেন, সেবক নূতন বস্ত্র শীঘ্রই বের করে দিলেন। মহারাজ পরিধান করে নূতন আসনে বসে দ্বাদশ অঙ্গে তিলকাদি ধারণ করলেন। নিত্য নিয়মিত জপ অন্তে শ্রীতুলসীতে জল প্রদান করে প্রদক্ষিণ করলেন ও তথা হতে শ্রীজগদীশের উদ্দেশ্যে প্রণাম করলেন। অতঃপর প্রসাদ সেবা করলেন। একটু বিশ্রাম করার পর সেবককে ডাকলেন এবং নিতা নিয়মিত শ্রীচৈতন্যভাগবত তাঁর সম্মুখে পড়তে আদেশ করলেন। পাঠ শ্রবণের জন্য তিনি এক নূতন আসনে বসলেন, হস্তে নামের জপ মালিকা ছিল। শ্রবণ করতে করতে মাঝে মাঝে উচ্চৈঃস্বরে হা গৌরহরি, হা নিত্যানন্দ বলে ডাকছেন। তখন শ্রীচৈতন্যভাগবতের মধ্য লীলায় শ্রীমহাপ্রভুর নগর সংকীর্তনের কথা সেবক ব্রহ্মচারী সুস্বরে পাঠ করেন
তথাহি –পাহিড়া রাগ
নাচে বিশ্বম্ভর
জগত ঈশ্বর
ভাগীরথী তীরে তীরে।
যার পদধূলি
হই’ কুতূহলী
সবে ধরিল শিরে।।
অপূর্ব্ব বিকার
নয়নে সু ধার
হুঙ্কার গর্জ্জন শুনি।
হাসিয়া হাসিয়া,
শ্রীভুজ তুলিয়া
বলে ‘হরি হরি’ বাণী।।
মদন সুন্দর
গৌর কলেবর
দিব্য বাস পরিধান।
চাঁচর চিকুরে
মালা মনোহরে
যেন দেখি পাঁচ বাণ।।
চন্দন চৰ্চ্চিত
শ্রীঅঙ্গ শোভিত
গলে দোলে বনমালা।
ঢুলিয়া পড়য়ে,
প্রেমে থির নহে
আনন্দে শচীর বালা।।
কাম শরাসন,
ভ্রু-যুগ পত্তন
ভালে মলয়জ বিন্দু।
মুকুতা দশন
শ্রীযুত বদন
প্রকৃতি করুণাসিন্ধু।।
ক্ষণে শত শত,
বিকার অদ্ভূত
কত করিব নিশ্চয়।
অশ্রু,, কম্প, ঘর্ম,
পুলক বৈবর্ণা
না জানি কতেক হয়।।
ত্রিভঙ্গ হইয়া
কভু দাঁড়াইয়া
অঙ্গুলে মুরলী বায়।
জিনি মত্ত গজ
চলই সহজ
দেখি নয়ন জুড়ায়।।
অতি মনোহর
যজ্ঞ-সূত্র-বর
সদয় হৃদয়ে শোভে।
এ বুঝি অনন্ত
হই গুণবন্ত
রহিলা পরশ লোভে।।
নিত্যানন্দ চাঁদ
মাধব নন্দন
শোভা করে দুই পাশে।
যত প্রিয়গণ
করয়ে কীৰ্ত্তন
সবা চাহি চাহি হাসে।।
যাঁহার কীর্তন,
করি অনুক্ষণ
শিব দিগম্বর ভোলা।
সে প্রভু বিহরে
নগরে নগরে।
করিয়া কীৰ্ত্তন খেলা৷
(চৈঃ ভাঃ ২৩।২৭১-২৮০)
এ পর্যন্ত শ্রবণ করে শ্রীল মহারাজ প্রেমভরে অজস্র অশ্রুপাত করতে করতে রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন—শ্রীগৌরসুন্দরের দুই পাশে শ্রীনিত্যানন্দ ও শ্রীগদাধর কি অপূর্ব্ব শোভা পাচ্ছেন। এই বলে হাতের জপ মালিকাটি সামনে চৌকির উপর রেখে কর জোড়ে নতশিরে অতি করুণস্বরে হা গৌর ! হা নিতাই ! হা গদাধর ! বলে তিনি যেন নিঃশব্দে বসে আছেন। কিছুক্ষণ পাঠের পর তাঁর কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে, পাঠক ব্রহ্মচারী মহারাজ ! মহারাজ ! বলে কয়েকবার ডাকলেন, তথাপি কোন সাড়া না পেয়ে মহারাজের শ্রীঅঙ্গে হাত দিয়ে দেখলেন তিনি আর এ জগতে নাই। যোগাসনে বসে শ্রীশ্রীমন্মহাপ্রভুর নিত্য মহাসংকীর্ত্তন রাস লীলায় চলে গেছেন।
শ্রীল মহারাজকে মর্ত্যলোকে আর দেখতে না পেয়ে ভালোণ বিরহ বেদনাশ্রু জলে বক্ষস্থল প্লাবিত করতে করতে রোদন করতে লাগলেন। সকলের শ্রীহরিদাস ঠাকুরের অন্তর্ধানের কথা মনে হতে লাগল। গৌড়ীয় বৈষ্ণব জগতে একটি মহারত্ন অন্তর্হিত হলেন।
এ মহাপুরুষের অপার কৃপা ও গুণের কথা কি বর্ণন করে সমাপ্ত করতে পারব? তথাপি মুকের ভাগ্য ও জিহ্বার উল্লাসে কিছু বলে যাই। এরা স্নেহ ছিল সহস্ৰ পিতৃ-মাতৃ স্নেহ সম। সেই স্নেহের আকর্ষণে আমার ন্যায় শিশু মহাপ্রভুর সেবায় নিযুক্ত হয়েছিল।
তিনি বলতেন প্রথমে সাধু-গুরু-বৈষ্ণব সেবা, সঙ্গে সঙ্গে ভগবতগ্রন্থ অনুশীলন ও কথা শ্রবণাদি করতে হবে। সেবা করার সঙ্গে সঙ্গে হরিকথা শ্রবণ করতে হবে। “শুশ্রূষা”- সেবা করার ইচ্ছা, শ্রবণ করার ইচ্ছা যার আছে সেই শুশ্রূষু ব্যক্তি। তিনি হাতে ধরে সকলকে সেবা শিক্ষা দিতেন আবার সংগ্রহানুশীলন এবং ভাগবত ও গীতা অনুশীলনের দিকে সুতীক্ষ্ণদৃষ্টি রাখতেন।
শ্রীল মহারাজ হরিকথা নোট করতে বলতেন, আর বলতেন যাদের স্মরণ শক্তি নাই তাদের হরিভজন হবে না। প্রাতকোলে মাধুকরী ভিক্ষা করতে যেতাম, রাত্রে তাঁর মুখে যে সমস্ত কথা শুনতাম তা লোকের কাছে বলতাম। বিকালে গৌড়ীয় মঠের সারস্বত শ্রবণ সদনে শ্রীল মহারাজ ইষ্টগোষ্ঠী ক্লাস করতেন। জিজ্ঞাসা করতেন মাধুকরী করতে গিয়ে কার সঙ্গে কি কি কথা বলেছ? রাত্রে আপনার থেকে যে সব কথা শুনেছি তাই বলেছি তা শুনে তিনি বড় খুশী হতেন, বলতেন হরিকথা ভাল করে নোট করে নিও। লোকের কাছে বলতে পারবে। নিজে শুনতে হবে। সেবা করতে হবে। অন্যকে শুনাতে হবে, সেবা করাতে হবে।
প্রায় সাত আট বছর কাল শ্রীল মহারাজের সেবায় নিযুক্ত ছিলাম। এক বার মহারাজকে বললাম মায়াপুরে টোলে ব্যাকরণ পড়ব কি? তিনি বললেন— সেবা কর শ্রীহরি-গুরু-বৈষ্ণব কৃপায় তোমার সর্ব্বতত্ত্ব স্বয়ং স্ফুরিত হবে। সেবোন্মুখের স্বয়ং সৰ্ব্বতত্ত্ব স্ফুরিত হয়। আর আমি পড়বার কথা বললাম না। চিন্তা করলাম পড়তে ত আসি নাই; সেবা করবার জন্য এসেছি। পড়ে কি হবে? অন্য দিন মহারাজ বললেন যে সমস্ত কথা হচ্ছে তা ভাল ভাবে শুন। তাতে পড়ার কাজ হবে।
তখন শ্রীচৈতন্য মঠের নাট্যমন্দিরে ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীশ্রীমদ্ভক্তি প্রসাদ পুরী গোস্বামী ঠাকুর প্রতিদিন ভক্তি সন্দর্ভ পাঠ করতেন। আমরা তা মনোযোগের সহিত শুনতাম। এ সব কথা ইংরাজী ১৯৪৬ সালের। শ্রীল তীর্থ মহারাজ কোন কোন দিন ইষ্টগোষ্ঠী ক্লাস করতেন। তখন সকলকে বক্তৃতা করা শিখাতেন। আমরাও বক্তৃতা করতে শিখতাম। পাঁচ মিনিট বলবার পর আর বলতে পারতাম না। মহারাজ বলতেন বলতে বলতে হবে। শ্রীল মহারাজ সেবা বিষয়ে কিংবা পাঠ বক্তৃতা বিষয়ে সকলকে খুব উৎসাহ দিতেন। তিনি অতিশয় সরল ছিলেন। কোন কোন দিন আমাদের বলতেন তোরা কুড়ে। “পূর্বে রান্না অর্জন করে শ্রীল প্রভুপাদের ভোজন করায়ে দৈনিক নদীয়া প্রকাশ বিক্রী করতে নবদ্বীপে যেতাম। বৈকালে এসে ঠাকুর জাগাতাম, রান্না করতাম, প্রবন্ধ লেখা প্রভৃতি সেবা করতাম। তখন মায়াপুরে পাকা মন্দির হয়নি। চৈতন্য মঠে, শ্রীবাস অঙ্গনে ও যোগপীঠে খড়ের ঘর ছিল। চাষী রেখে বাগ বাগচার কাজ ও জমি চাষ প্রভৃতি করাতাম। তাতে ধান কলাই মটর যাহা হত তার দ্বারা সারা বৎসর প্রভুর সেবা চলত।”
শ্রীল মহারাজ পরম দয়ালু ছিলেন। সকলকে হরিভজন করাতে চাইতেন। যাঁরা পাঠ কীৰ্ত্তনে যোগদান করতে অবহেলা করতেন, তাদের তিনি বলতেন, —তুই আজ খেতে পাবি না। পাঠের সময় অনেক ব্রহ্মচারী ঘুমায় দেখে একদিন প্রসাদ পাওয়া স্থানে পাঠ করতে লাগলেন। সকলের সামনে প্রসাদের থালা। বললেন এখন দেখি কে ঘুমায়? যারা ইষ্টগোষ্ঠী ক্লাসে ভাল বলতে পারতেন না তাদের দাঁড় করিয়ে শ্লোক মুখস্থ করাতেন। স্নেহ করে কাকে মারতেনও। মহারাজ ছিলেন শিক্ষা গুরু। তিনি বলতেন বিষ্ঠার জলে পূর্ণ কলসী গঙ্গায় ডুবালে কি হবে? যতটা বিষ্ঠার জল কম হবে ততটা গঙ্গা জল ঢুকবে। তোর যতটা হরিকথা কানে যাবে ও যতটা সেবা করবি, ততটা ভক্তি লাভ হবে। বিষয় বিষ্ঠা জলে হৃদয় কলসী ভরা থাকলে ভক্তি গঙ্গা জল তাতে ঢুকতে পারে না।
তিনি আরও বলতেন——–সম্বন্ধ জ্ঞান না হলে ভক্তি হয় না। ব্রহ্মচারী, গৃহস্থ, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাসীর অভিমান ছাড়তে হবে। আমি শ্রীকৃষ্ণ দাসানুদাস এই অভিমান চব্বিশ ঘণ্টা মনে রাখতে হবে। এই অভিমান ভুললে মায়া এসে ধরবে। জীবের কৃষ্ণ সেবা করাই হল স্বধর্ম। পতিব্রতার স্বামী-সেবাই যেমন স্বধর্ম। যাঁরা কৃষ্ণ সেবা করে না তারা স্বধর্মত্যাগী বেশ্যা। সাধু, গুরু ও কৃষ্ণকে কান দিয়ে দেখ। অর্থাৎ শ্রৌত পথে শ্রবণ কর। চক্ষু দিয়ে দেখলে পাপ। আগে শ্রবণ, পরে দর্শন। যারা হরিকথা শুনে না তাদের দর্শন হয় না।
শ্রীল মহারাজ সেবকগণকে কখনও অমর্যাদা করতেন না। সকলকে ‘প্রভু’ বলে সম্বোধন করতেন। পত্র লিখলে পত্রের প্রারম্ভে “শ্রীশ্রীভাগবত চরণে দণ্ডবৎ প্রণতি পূঝিকেয়ং” পত্রের শিরোনামায় লিখতেন “পরম ভাগবত ইংরেজি ১৯৪৮ সালের কার্তিক মাসে আমি প্রথম ”দশবতার বন্দনা ” পদ্য লিখে তা ছাপিয়ে শ্রীল মহারাজের শ্রীকরকমলে অর্পণ করি। তিনি তা পেয়ে কত আনন্দ ভরে আমাকে কৃপাশীৰ্ব্বাদজনক এক পত্র দেন— তোমার শ্রীশ্রীদশাবতার বন্দনা” বন্দনা-পূৰ্ব্বত গ্রহণ করিয়া শিরে ধারণ করিলাম। বন্দনা রচনা নৈপুণ্যে শুদ্ধা সরস্বতী (ভক্তিসিদ্ধান্ত) যে তোমার কণ্ঠে উদিত হইয়া লেখাইয়াছেন তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। কবে তোমার শ্রীমুখে এই শ্রীদশাবতার বন্দনা কীৰ্ত্তন-মুখে শুনিবার সৌভাগ্য পাইব। তোমাদের সর্ব্বাঙ্গীন কুশল প্রার্থী, বৈষ্ণব দাসানুদাস—শ্রীভক্তি প্রদীপ তীর্থ।
শ্রীশ্রী মহারাজের দয়া দাক্ষিণ্যের তুলনা হয় না। অধিক আর কি বলব। তাঁর সেই কৃপামৃতের বিন্দু গলবস্তু কৃতাঞ্জলি হয়ে প্রার্থনা করি। জন্মে জন্মে যেন তাঁর আশীর্ব্বাদ বাণী শিরে ধারণ করে শ্রীশ্রীহরি-গুরু-বৈষ্ণগনের শ্রীচরণ সেবা করতে পারি। ইহাই আমার একমাত্র বিনীত প্রার্থনা।