(শ্রী চতুঃসনের অন্যতম শ্রী সনাতনসহ শ্রীনারদের কথোপথন অবলম্বনে)
শ্রীনারদ জিজ্ঞাসা করলেন—হে মুনিশ্রেষ্ঠ! আপনি কৃপাপূর্ব্বক বারমাসের এবং একটি অধিক মাসের সর্বমোট ছাব্বিশটি একাদশী আছে, তা কি বিধিতে করতে হয় সম্যক প্রকারে বর্ণন করুন।
শ্রী সনাতন বললেন—হে নারদ, তুমি সর্ব্বদাই লোকহিতে নিরত, তজ্জন্য তোমার প্রশ্নগুলিও সকলের পরম সুখদায়ক। কৃষ্ণপক্ষের ও শুক্লপক্ষের উভয়পক্ষের একাদশী সমূহ অবশ্য করণীয়। অধুনা একাদশী ব্রত করণীয় বিধিসকল বলছি শ্রবণ কর। একাদশী ব্রতোৎসব উদযাপনকারী দশমী দিবসের অপরাহ্নে অধিবাস মণ্ডপ, কদলী স্তম্ভ আরোপণ, আম্রপত্রাদি তোরণ, মঙ্গলঘট স্থাপন, সন্ধ্যাস্নান, নববস্ত্রাদি ধারণ, দ্বাদশ অঙ্গে তিলক রচনা ও বৈষ্ণব আমন্ত্রণ, সন্ধ্যাকালোচিত শ্রীবিষ্ণু অর্চ্চন ও নামসংকীর্ত্তন করবে। অতঃপর মঙ্গল অধিবাস সঙ্কীৰ্ত্তন। মঙ্গল অধিবাসান্তে বৈষ্ণবগণকে প্রসাদ দান, ব্রতকারী উপবাসী থাকবেন, এরূপে দশমী দিবসের রজনীর করণীয় সমাপ্ত করবে। চৈত্রকৃষ্ণপক্ষে পাপমোচনী একাদশী ব্রত। শ্রীগোবিন্দের অর্চ্চন, প্রাতঃস্নান, ধৌতবস্ত্র পরিধান, দ্বাদশ অঙ্গে তিলক, আচমন ‘ওঁ শ্রী বিষ্ণু ওঁ শ্রী বিষ্ণু ওঁ শ্রী বিষ্ণু’ তিনবার বলবার পর সংকল্প বাক্য উচ্চারণ করবে, অনন্তর নমস্কারপূর্বক “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়” এই মন্ত্রে আসন, পাদ্য, অঘ্য, আচমন, মধুপর্ক, তৈল, স্নানোদক, বস্ত্র, উপবীত, গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দাপ, নৈবেদ্য, আচমন, তাম্বুল, মাল্য প্রদান পূৰ্ব্বক পূজা করবে ও স্তব পাঠাদি করবে। পঞ্চমৃত— দধি, দুগ্ধ, ঘৃত, মধু ও শর্করা দ্বারা স্নান করাইবে।
স্নানমন্ত্র –ওঁ সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ।
স ভূমিং বিশ্বতো বৃত্বাত্যতিষ্ঠদ্দশাঙ্গুলম্।।
নৈবেদ্য—গুড়দ্বারা পায়স, ক্ষীর, শঙ্কুলি, পিষ্টক, সরপুলী, রোটিকা, ঘৃতান্ন, অমৃতকেলী, অন্ন, লুচি, ব্যঞ্জন, লাড্ডু, রসাবলী ও বিবিধ ফলমূলাদি অৰ্পণ করবে। অতঃপর আরতি মহাসঙ্কীৰ্ত্তনসহ সমাপনপূর্বক দণ্ডবৎ করতঃ বৈষ্ণব সঙ্গে শ্রী গোবিন্দের কথা শ্রবণ কীর্ত্তন করবে।
অহোরাত্র গোবিন্দকথা কীৰ্ত্তনান্তে প্রাতঃস্নান সমাপ্তপূর্বক ধৌত বস্ত্ৰ পরিধান করতঃ পঞ্চমৃতেশ্রীগোবিন্দ স্নানাদি দিয়া উত্তম নৈবেদ্যাদি অৰ্পণপূর্বক পারণ, বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ সেবা, দান দক্ষিণা অর্পণ করবে। এইরূপে অতিথি অভ্যাগত সেবা করার পর সবান্ধবে ভোজন করবে।
গোবিন্দ মহিমা কথারম্ভ-তথাহি গোপালচম্পূ পূর্ববচম্পূ।
পূর্ব্বে দ্বাপরযুগে নন্দীশ্বরে শ্রীপর্জ্জন্য নামক এক গোপরাজ বাস করতেন, তাঁর ধর্মপত্নীর নাম শ্রীবরীয়সী গোপী। উভয়ে মহাধর্মপরায়ণ, দান পূজাদি কার্য্যে তৎপর ছিলেন, তাঁর গৃহ অষ্টনিধি পরিপূর্ণ ছিল। কালে উপানন্দ, অভিনন্দ, নন্দ, সুনন্দ ও নন্দন নামে পাঁচটি পুত্ররত্ন জন্মগ্রহণ করেন।
পর্জ্জন্য গোপরাজ রাজ্যপদ শ্রীনন্দকে অর্পণ করলেন। উপানন্দাদি ভ্রাতৃবর্গ শ্রীনন্দকে অতিশয় স্নেহ করতেন ও সতত হিতোপদেশ দানে পোষণ করতেন। অতঃপর শ্রীনন্দরাজগৃহে সর্ব্বানন্দ স্বরূপ মহানন্দময় এক পুত্ররত্ন হলেন। গর্গমুনি তাঁর নামকরণ করলেন ‘শ্রীকৃষ্ণ’। নন্দগৃহে চন্দ্রকলাসম দিন দিন কৃষ্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে লাগলেন। কত অলৌকিক লীলাবিলাসও তিনি করতে লাগলেন। তাঁর অপূর্ব্ব রূপমাধুরী, লীলামাধুরী, বংশীমাধুরী ও গুণমাধুরীতে ত্রিলোককে মুগ্ধ করতে লাগলো। শ্রীকৃষ্ণ সপ্তম বর্ষে পদার্পণ করলেন। কার্ত্তিক অমাবস্যা দীপাবলী মহোৎসব এবং শুক্লা দ্বিতীয়াতে ইন্দ্ৰযাগ মহামহোৎসব। গোপগণের এই হল বাৎসরিক মহোৎসব। গৃহে গৃহে প্রচুর পরিমাণে অন্ন, রুটি, পুরি পায়স বিবিধ মিষ্টান্ন তৈয়ারি হচ্ছে। কৃষ্ণ সর্ব্বান্তর্যামী হলেও উহার কারণ তিনি বিনীতভাবে পিতা নন্দ ও জ্যেঠা এবং পিতৃব্যাদিকে জিজ্ঞাসা করলেন-এই উৎসব কোন্ দেবতার উদ্দেশ্যে হচ্ছে?
শ্রী নন্দ মহারাজ বললেন—আমাদের চির কুলপ্রথানুসারে ভগবান্ ইন্দ্রের পূজা হচ্ছে। কেননা ইন্দ্র সমস্ত দেবগণেরও ঈশ্বর। তাঁর আজ্ঞা মত সকলেই স্ব-স্ব কার্যাদি করছেন। তাঁর আজ্ঞায় মেঘ বর্ষণাদি করে, তদ্বারা পৃথিবী শস্যাদিতে পরিপূর্ণ হয়, আমরা গোপজাতি, আমাদের গোধন প্রতিপালন বিশেষ কৰ্ম্ম; বনে বনে ঘাস, তৃণ শস্যাদি হল আমাদের সর্বস্ব। অতএব ইন্দ্রপূজা না করলে আমাদের প্রত্যবায় উপস্থিত হবে।
Hare Krishna




